এফ ১৬ ফাইটিং ফ্যালকন
ফাইটার সিরিজ ৯: এফ ১৬ ফাইটিং ফ্যালকন
এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন আমেরিকায় তৈরি ৪র্থ জেনারেশন মাল্টিরোল ফাইটার। এটি অন্য বিমানের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করতে পারে আবার ছোটখাট বোমারু বিমানের ভূমিকাতেও নামতে পারে। ১৯৭৮ সালে প্রথম সার্ভিসে এলেও এখনও এটা আমেরিকার প্রধান মাল্টিরোল ফাইটার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। ইউএস এয়ার ফোর্সে যেসব বিমান বর্তমানে আছে তার মধ্যে এফ-১৬ ই সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন কারনে এফ ১৬ নিয়ে আলোচনা সমালোচনাও অনেক।এ্ই বিমানকে “ভাইপার” নামেও ডাকা হয়।এফ -১৬ এর প্রথম দিকের সংস্করন F-16A (single seat) and F-16B (two seat)নামে পরিচিত। পরের সংস্করন F-16C (single seat) and F-16D (two seat)নামে পরিচিত।
এর আগে এফ -১৫ ঈগল নিয়ে পোস্টেই বলেছিলাম ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরে ইউএস এয়ার ফোর্সে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।যুদ্ধে পরাজয়ের কারন খুজতে গিয়ে দোষ আসে তৎকালীন আমেরিকার এয়ার ফোর্স ও নেভির প্রধান ফাইটার এফ-৪ ফ্যান্টম এর উপর। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সকল ফ্যান্টম পরিবর্তন করে নতুন ফাইটার বিমান নেওয়ার। এক্ষেত্রে প্রথমে হেভিওয়েট ফাইটার হিসেবে এফ-১৫ ঈগলকে বাছা হয়।কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালি গ্রুপ গড়ে উঠে যারা “ফাইটার মাফিয়া” নামে পরিচত।
“ফাইটার মাফিয়া” সর্বস্তরে প্রচার করে যে এফ-৪ ফ্যান্টম নিয়ে ইউএস এয়ার ফোর্সে যে ভূল করেছে সেই একই ভূল আবার করতে যাচ্ছে এফ-১৫ ঈগলকে নিয়ে।হালকা মিগ-২১ এর কাছে এফ-৪ ফ্যান্টম এর পরাজয় হয়েছে আয়তনে বড়, ভারী, ম্যানুভারিটির দিকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধু লং রেঞ্জ অস্ত্রের দিকে গুরুত্ব দিয়ে।আমেরিকার দরকার হালকা ছোট সাইজের ফাইটার যা দিয়ে পাইলটরা নিজেদের কেরামতি দেখাতে পারবে। শেষ পর্যন্ত তাদের দাবী মানা হয় তবে এফ-১৫ ঈগলকে বাদ না দিয়ে আরেকটি “লাইটওয়েট ফাইটার” প্রকল্প নেওয়া হয় যার মাধ্যমে এফ-১৬ ফ্যালকন তৈরি হয়।
৫টি কোম্পানীর মডেল পর্যবেক্ষণের পর ইউএস এয়ার ফোর্সের “জেনারেল ডাইন্যামিক্সের” তৈরি মডেল পছন্দ হয় এবং জেনারেল ডাইন্যামিক্স লাইটওয়েট ফাইটার তৈরির দায়িত্ব পায় যার নাম দেওয়া হয় এফ -১৬ ফাইটিং ফ্যালকন। ১৯৭৪ সালে এর প্রথম প্রটোটাইপ আকাশে ওড়ে এবং সার্ভিসে আসে ১৯৭৮ সালে। উৎপাদন খরচ কম ও মাল্টিরোল হওয়ায় পরবর্তিতে এটাই ইউএস এয়ার ফোর্সের প্রধান ফাইটারে পরিনত হয় এবং অন্য দেশে রপ্তানিও শুরু হয়। সব মিলিয়ে প্রায় সারে চার হাজার এফ -১৬ তৈরি হয়েছে।১৯৯৩ সালে জেনারেল ডাইন্যামিক্সের ফাইটার তৈরির শাখা লকহিড কোম্পানীর কাছে বিক্রি করে দেয়। তাই বর্তমানে “লকহিড-মার্টিন” এফ -১৬ প্রস্তুতকারক কোম্পানী।
এফ -১৬ ফ্যালকন এক ইঞ্জিন বিশিষ্ট ফাইটার। এর সর্বোচ্চ গতি ম্যাক ২, অর্থাৎ ঘন্টায় ১৫০০ মাইল বা ২৪১০ কিলোমিটার।এতে ঐ সময় বেশ কিছু নতুন টেকনোলজি অন্তর্ভূক্ত হয় যা পরবর্তীতে তৈরি অন্যন্য নতুন ফাইটারে স্ট্যান্ডার্ড হয়ে দারায়। এতে প্রথম Fly-by-wire ব্যাবহার হয় যাতে বিমান নিয়ন্ত্রনের বেশকিছু অংশ কম্পিউটারের কাছে ছাড়া হয়। পাইলটদের দেখার সুবিধা বাড়ানোর জন্য Bubble Canopy দেওয়া হয়। এই ফাইটার অত্যন্ত ম্যানুভারেল যার কারনে ক্লোজ রেঞ্জ ডগফাইটের উপযোগী।তৈরির পর এপর্যন্ত বিভিন্ন আপগ্রেড হয়েছে যাতে রাডারসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। সম্প্রতি এতে “হেলমেট মাউন্টেড সাইট” সংযুক্তিরও ঘোষনা দেওয়া হয়েছে।
এফ -১৬ ফ্যালকনে অস্ত্র হিসেবে ৫১১ রাউন্ডের ২০ মি.মি M61 Vulcan গ্যাটলিং গান আছে।এছাড়া ১১ টি হার্ডপয়েন্ট আছে যাতে সাইডউইন্ডার, স্প্যারো, মাভেরিক, হার্পূন প্রভূতি বিভিন্ন ধরনের মিজাইল ও লেজার গাইডেড বোমাসহ বিভিন্ন ধরনের বোমা ব্যাবহার করা যায়।
এফ -১৬ ফ্যালকনের প্রধান ব্যবহারকারী ইউএস এয়ার ফোর্স। একসময় তাদের ২০০০ এর বেশি এফ -১৬ থাকলেও বর্তমানে তা ১৫০০ এর নিচে নেমে এসেছে। এফ -১৬ কে এফ -৩৫ দিয়ে রিপ্লেস করা হবে এবং ২৫ সাল নাগাদ তাদের সকল এফ -১৬ অবসরে যাবে।২৫ টি দেশে এফ -১৬ রপ্তানী করা হয়েছে যার মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে ইসরাইল সবচেয়ে বেশি কিনেছে।তাদের প্রায় ৩০০ এফ -১৬। ৩য় তুরস্ক। এরা লাইসেন্স নিয়ে তৈরি করে, ২১০+ আছে।৪র্থ মিশর, ২০৮ টি আছে।পাকিস্তানের ৬০ টি এফ -১৬ আছে এবং ১৮+১৪ টি কেনার অর্ডার দিয়েছে। এছাড়া যাদের আছে Bahrain, Belgium, Chile, Denmark, Greece, Jordan, Indonesia, Italy, Morocco, Netherlands, Norway, Oman, Poland, Portugal, Singapore, South Korea, Republic of China (Taiwan), Thailand, United Arab Emirates and Venezuela.
আমেরিকা এফ -১৬ প্রথম যুদ্ধে নামানোর সুযোগ পায় ১৯৯১ এর গালফ ওয়ারে।যুদ্ধে ইরাকের বিরুদ্ধে প্রায় ২৫০ এফ -১৬ নিযুক্ত হয়। এখানে এফ -১৬ এর ভূমিকা ছিল এট্যাক রোলে বম্বিং করানোর।প্রচুর বোমা ফেললেও আকাশে অন্য বিমান ধ্বংসের সুযোগ পায়নি। যুদ্ধে ইরাকী সারফেস-টু-এয়ার মিজাইল (স্যাম) এবং গ্রাউন্ড ফায়ারে ৭ টি এফ -১৬ ধ্বংস হয়।পরবর্তিতে ইরাকী নো-ফ্লাই-জোনে টহল দেওয়ার সময় আমেরিকানরা এফ -১৬ ফ্যালকন নিয়ে প্রথম একটি ইরাকী মিগ -২৫ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে আরও একটি ইরাকী মিগ -২৩, এফ -১৬ ফ্যালকন ধ্বংস করে।বলকান যুদ্ধে ন্যাটো অপারেশনে আমেরিকান এফ -১৬ অংশ নেয়, ৪টি সার্বিয়ান ফাইটার ধ্বংস করে ও ২ টি এফ -১৬ ধ্বংস হয়।বর্তমান আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে এফ -১৬ ব্যাবহার হচ্ছে, সাফল্য ব্যার্থতার সঠিক হিসাব প্রকাশিত নয়। তবে ইরাকে অন্তত ২ টি এফ -১৬ ধ্বংস হয়েছে।
ছবি: ইসরাইলী এফ ১৬
এফ ১৬ ফ্যালকন নিয়ে যুদ্ধে বেশি সাফল্য ইসরাইলের। ১৯৮১ সালে এফ -১৫ এর পাহাড়ায় এফ -১৬ বিমান দিয়ে বম্বিং করে ইরাকে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস করে। সিরিয়ার মিগ-২১ ও মিগ-২৩ এর বিরুদ্ধে ইসরাইলী এফ -১৬ ভাল সাফল্য পায় তবে এক্ষেত্রে হতাহতে পরিসংখ্যান নিয়ে গড়মিল আছে।
যেহেতু এফ -১৬ ফ্যালকনকে এফ -৩৫ লাইটিং দিয়ে রিপ্লেস করা হবে তাই আমেরিকা বর্তমানে বিভিন্ন দেশের কাছে এফ -১৬ বিক্রি করতে চাচ্ছে। বাংলাদেশও এফ ১৬ কেনার প্রস্তাব পেতে পারে।
এফ -১৬ ই/এফ ব্লক ৬০ সুপার ভাইপারঃ
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য তাদের অর্থায়নে এই F-16E/F বিশেষ সংস্করন তৈরি। এগুলোই এফ -১৬ সর্বাধুনিক সংস্করন। সংযুক্ত আরব আমিরাত ৮০ টি এফ -১৬ ই/এফ কিনেছে। এর আংশিক প্যাটেন্টও তাদের। এতে এফ -১৬ সি/ডি থেকে শক্তিশালী ইঞ্জিন, রাডার ও অন্যান্য আপগ্রেড যন্ত্রপাতি আছে। ভারতের কাছে এটা বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।ছবিঃ সংযুক্ত আরব আমিরাতের এফ ১৬ ই
এছাড়া জাপান মিটসুবিশি-এফ-২ নামে এফ ১৬ এর বিশেষ উন্নত সংস্করন তৈরি করেছে।
ছবি: মিটসুবিশি এফ-২
বিশদ বিবরন (এফ ১৬ সি ফ্যালকন):
বৈমানিক : ১ জনদৈর্ঘ্য: ১৫ মিটার
উচ্চতা: ৫ মিটার
খালি অবস্হায় ওজন : ৮৫৭০ কেজি
বোঝা ভরা অবস্হায় ওজন : ১২০০০ কেজি
সর্বোচ্চ টেক অফ ওজন : ২৯২০০ কেজি
শক্তির উৎস : ১টি General Electric F110-GE-100/129 আফটার বার্নিং টার্বো ফ্যান
সর্বোচ্চ গতি : উচ্চতায়-২৪১০ কিঃমিঃ/ঘন্টা
পাল্লা : ৪২২০ কিঃমিঃ (ফেরি)
অস্ত্রসমুহ:
১ টি ২০মিমি M61 Vulcan gatling gun,(৫১১ রাউন্ড)
১১ টি হার্ডপয়েন্ট আছে যাতে সাইডউইন্ডার, স্প্যারো, মাভেরিক, হার্পূন প্রভূতি বিভিন্ন ধরনের মিজাইল ও লেজার গাইডেড বোমা, রকেট,নিউক্লিয়ার বোমাসহ বিভিন্ন ধরনের বোমা ব্যাবহার করা যায়।
ফাইটার সিরিজের পূর্ববর্তী পোস্ট:
ফাইটার সিরিজ ১: মিগ-২৯ মাল্টিরোল ফাইটার
ফাইটার সিরিজ ২: ফাইটার কত প্রকার ও কি কি
ফাইটার সিরিজ ৩: এফ ২২ র্যাপটর
ফাইটার সিরিজ ৪: এসইউ ২৭ ফ্লান্কার
ফাইটার সিরিজ ৫: ইউরোফাইটার টাইফুন
ফাইটার সিরিজ ৬: মিগ ২১
ফাইটার সিরিজ ৭: এফ ১৫ ঈগল
ফাইটার সিরিজ ৮: এস আর -৭১ ব্ল্যাকবার্ড
মন্তব্যসমূহ